জুলাই সনদ নিয়ে গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ মেটানোর দায় এড়িয়ে অন্তর্বর্তী সরকার এই দায়িত্ব বিবদমান পক্ষগুলোর ওপরই চাপিয়ে দিয়েছে। বল ঠেলে দেওয়া হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর কোর্টে। রেফারি হিসেবেও থাকতে চাইছে না সরকার। অথচ অন্তর্বর্তী সরকারের মূল দায়িত্বই হচ্ছে এ ধরনের পরিস্থিতিতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেওয়া।
সরকার সেই দায়িত্ব এড়াতে চাইলে জটিলতা কমবে না। বিশেষজ্ঞদের এমনটাই বিশ্লেষণ। রাজনৈতিক দলের পক্ষেও বলা হচ্ছে, সরকার জুলাই সনদ নিয়ে সাপ-লুডু খেলছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকার নিজেরা উদ্যোগ না নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে ঠেলে দিয়েছে।
এ বিষয়ে দলগুলোর অবস্থান ও মতামত জানে সরকার। তার পরও হয়তো সরকার নিজেদের বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাদের কোর্টের বল রাজনৈতিক দলগুলোর কোর্টে দিয়ে দিয়েছে। আবার কারো মতে, মুক্তিযুদ্ধের আগে ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিব ও ভুট্টোর মধ্যে ঐকমত্যে আসার জন্য একটা সময় বেঁধে দিয়ে যে খেলা শুরু করেছিলেন, এখনো সে রকমই হচ্ছে।
গত সোমবার জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রণীত জুলাই সনদ এবং এর বাস্তবায়নসংক্রান্ত বিষয়ে উপদেষ্টা পরিষদের এক জরুরি সভার পর গণভোট কবে হবে, এর বিষয়বস্তু কী হবে এবং জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত ভিন্নমতগুলো প্রসঙ্গে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে—এসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে দ্রুততম সময়ে, সম্ভব হলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ দিকনির্দেশনা দেওয়ার আহবান জানিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, সরকার এ বিষয়ে দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার কোনো উদ্যোগ নেবে না। দলগুলো যদি ঐক্যবদ্ধ নির্দেশনা দিতে না পারে, অবশ্যই সরকার সরকারের মতো সিদ্ধান্ত নেবে।
সংকটের দায় নিতে চাচ্ছে না সরকারদলগুলোর প্রতিক্রিয়া : উপদেষ্টা পরিষদের এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। গত সোমবার রাজধানীর পুরানা পল্টনে খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সমমনা সাতটি দলকে নিয়ে বৈঠক করে জামায়াতে ইসলামী।
পরে সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের নায়েবে আমির আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘উপদেষ্টা পরিষদ যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটিকে আমরা স্বাগত জানাই। কিন্তু উপদেষ্টা পরিষদ যদি এটা মনে করে যে তাদের আর কোনো দায়িত্ব নেই, তারা কিছুই করবে না, দলগুলোই মিলে করবে, তাহলে এখানে একটা রেফারির অভাব হতে পারে। তো সে জন্য আমি বলছি, আমরাও চেষ্টা করব, উপদেষ্টাদের পক্ষ থেকে বিশেষ করে চিফ অ্যাডভাইজার (প্রধান উপদেষ্টা) এখানে একটা রেফারির ভূমিকা পালন করবেন। এটা আমি আশা করি।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, সরকারের ভেতরের কোনো একটা অংশ নির্বাচন ভণ্ডুল করতে চাইছে। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তাব অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করেনি সরকার। তাদের দাবি, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আদেশ দিতে হবে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকেই।
এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, সরকার সনদ নিয়ে সাপ-লুডু খেলছে। তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই সনদ নিয়ে সরকারের ভেতরে একটি পক্ষ নির্বাচন বানচালের চেষ্টা চালাচ্ছে।
উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধান্তকে মন্দের ভালো বলে মন্তব্য করেছেন বিল্পবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম সংগঠক সাইফুল হক। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই সিদ্ধান্তের দরকার ছিল না। সরকার চাইলে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে পারত। কারণ জুলাই সনদের বিষয়ে দলগুলোর অবস্থান ও মতামত জানে সরকার। তার পরও হয়তো সরকার নিজেদের বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাদের কোর্টের বল রাজনৈতিক দলগুলোর কোর্টে দিয়ে দিয়েছে।’
বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, ‘উপদেষ্টা পরিষদে আলোচনার পর জুলাই সনদের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে আলোচনা করে একটা অভিন্ন সুপারিশ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যা অবাস্তব ও কাল্পনিক। বাংলাদেশের বাস্তবতায় সেটা আদৌ কি সম্ভব?’
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন : প্রবীণ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী মনে করেন, সংকট সৃষ্টির জন্য রাজনৈতিক দলগুলোই দায়ী। সমাধানও দলগুলোর কাছ থেকেই আসতে হবে। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, “জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ৯ মাস ধরে তো অনেক আলোচনা করল। ঐকমত্য কমিশন দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করাতে পারেনি। এর জন্য দলগুলোই দায়ী। দলগুলোর মধ্যে এক ধরনের খেলা চলছে। ১৯৭০ সালে মুক্তিযুদ্ধের আগেও শেখ মুজিব ও ভুট্টোর মধ্যে এ ধরনের খেলা চলেছিল। রাজনৈতিক দলগুলো যদি জুলাই সনদ নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিরোধ মেটাতে না পারে, তাহলে দেশের সংকটের জন্য তাদেরই দায় নিতে হবে।”
অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী আরো বলেন, সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে গণভোট জাতীয় নির্বাচনের আগেই হওয়া উচিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সোহরাব হোসেন মনে করেন, বিদ্যমান সংকট নিরসনে সরকারই যদি রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে ডাকে তাহলে ভালো হয়। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জাতীয় স্বার্থে রাজনৈতিক দল ও সরকারকে সহযোগিতা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ মনোভাব পোষণ করতে হবে। সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে একটি সংলাপের উদ্যোগ যদি নেয়, তাহলে ভালো হয়।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের আরেক অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন. ‘ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভাজন আগেও ছিল, জুলাই সনদের সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে সেই বিভাজন আরো বেড়েছে। জুলাই সনদ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার এখন রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের মধ্যে বিরোধ মেটাতে বলছে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো কার ডাকে বসবে? কে কার বাসায় যাবে? একজন ডাকলে আরেকজন কেন যাবে? অনেকে বলতে পারেন, বল রাজনৈতিক দলগুলোর কোর্টে ঠেলে দিয়েছে সরকার। কিন্তু বিষয়টি তেমন বলে আমি মনে করি না। বরং মনে করি, এতে অন্তর্বর্তী সরকারের যে দায়িত্ব রয়েছে, সেটি এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমরা এ দেশের নাগরিক হিসেবে মনে করি, সরকারের উদ্যোগেই এ সংকট থেকে উত্তরণ ঘটবে।
Lorem Ipsum has been the industry’s standard dummy text ever since the 1500s, when an unknown printer took a galley of type and scrambled it to make a type specimen.
Lorem Ipsum has been the industry’s standard dummy text ever since the 1500s, when an unknown printer took a galley of type and scrambled it to make a type specimen.
Lorem Ipsum has been the industry’s standard dummy text ever since the 1500s, when an unknown printer took a galley of type and scrambled it to make a type specimen.